Wednesday, December 16, 2015

কল্পতরু মেলা থেকে সাংস্কৃতিক মেলা রূপান্তরের কিছু স্মৃতি

{ এই লেখাটি " সমাজ পরিবর্তনে মানুষ " পত্রিকা তে প্রকাশিত  }
                                                                                                   যুগল কিশোর ঝা


বাংলাদেশের উৎসব প্রাচুর্যের দেশ । বারো মাসে তের পার্বণ , বাঙালির সৃজন ধর্মী প্রতিভার আনন্দমুখর অভিব্যক্তি, উৎসবের পর আনন্দ ও কলহাস্য বাংলার ঘর আলোতে ভরিয়ে দেয় ।
বন্যা, দুর্ভিক্ষ ,মহামারিতে ,কত দৈব দুর্বিপাকে কত রাজনৈতিক দাঙ্গায় বাঙালির ভাগ্যাকাশে মানিয়ে এসেছে দুর্যোগের কালো মেঘ । কতবার বাঙালি প্রত্যক্ষ করেছে প্রাকৃতিক ও মানবিক কারনে নির্মম মৃত্যুর ভয়াবহ তাণ্ডব লীলা । কিন্তু বাঙালি তার দুর্বার প্রান প্রাচুর্যের দ্বারা সেসব জয় করেছে আর সৃষ্টি করেছে আনন্দ উৎসবের নিত্য ন্তুন পরিকল্পনা । এইরকম একটি উৎসব ছিল কল্পতরু মেলা । শীতের বিকেল টা আমাদের গ্যাম ন ব্রিজ সংলগ্ন মাঠে ১লা জানুয়ারি থেকে উৎসব মেলা সংগঠিত হতো । রামকৃষ্ণ সারদা মায়ের মূর্তি তে ১০ দিন ব্যাপি পুজা পাঠ ও সন্ধ্যা আরতি হতো । যদিও এই মেলার সুচনা সাধুদাঙ্গার রামকৃষ্ণ কালিকা নন্দ আশ্রমে হয়েছিল ।বর্তমানে ঐ আশ্রমের সেবাইত সাধু মহারাজের গুরুদেব এই আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন । পরবর্তী কালে সাধু মহারাজের উদ্যোগে রামকৃষ্ণ আশ্রম ও কালিকা নন্দ আশ্রম গড়ে ওঠে । আর এই আশ্রম দুটি গড়ে উঠেছে কালিকা নন্দ আশ্রমের জমিতে যা বিরভানপুরের জমিদাররা আশ্রম করতে দান করেন । এই মাঠে শুরু হয় "কল্পতরু উৎসব"  যা পরবর্তী সময়ে স্থানাভাবে গ্যাম ণ ব্রিজ সংলগ্ন অনুষ্ঠিত হতে থাকে ।সেই থেকে এই মাঠ কল্পতরু ময়দান নামে পরিচিতি লাভ করে ।
জরুরী অবস্থার সময় ডি পি এলের এম ডি মেজর জেনারেল প্রেমাংশু চৌধুরী যোগ দান করার পর তিনি এই মাঠ টাতে প্রকল্পের অধিবাসী দের জন্যে একটা সর্বাঙ্গীণ সুন্দর আধুনিক পার্ক, সুইমিং পুল করবেন বলে কল্পতরু উৎসবের বেদী ভেঙ্গে পাঁচিল দিয়ে ঘিরে দেন । সেই কারনে এই মেলাটি বন্ধ হয়ে যায় । তৎকালীন মেলা কমিটির সম্পাদক সুধাকর মুখার্জি  যিনি বর্তমানে দুরগাপুরে বাইরে থাকেন ।  আর কালিকা নন্দ আশ্রমের সাধু মহারাজ আজও বেঁচে আছেন সমস্ত ঘটনার সাক্ষী হিসাবে । খুব সম্ভবতঃ ১৯৭৮/১৯৭৯ সালে সুখেন সরকার আমাকে নিয়ে গেলেন সাধুবাবার কাছে ।তার সাথে আলোচনা হল কল্পতরু উৎসব ও মেলা ইতিহাস নিয়ে ।  সেদিন উৎসব ,মেলা ,ও আশ্রম নিয়ে অনেক অজানা তথ্য জানতে পেরেছিলাম । সেই সমস্ত তথ্য এক্ত্রিত করে "অগ্রণী" পত্রিকাতে " কল্পতরু মেলার উৎস সন্ধানে " নামে একটি বিস্তারিত লেখা প্রকাশিত হয় । আমার বিশ্বাস আজও সুখেন বাবুর কাছে সেই প্ত্রিকার কপি আছে । সেই লেখার মধ্যে ন্তুন করে মেলা সংগঠিত করার প্রস্তাব ছিল । এলাকায় ন্তুন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলার প্রয়োজনে ।
সুখেন বাবুর কথাতে বলি " দুরগাপুরে সুস্থ সাংসকৃতির অঙ্গ হিসাবে বিশেষ প্রয়োজনে অনুষ্ঠিত একটি সাংস্কৃতিক মেলার । হাজার হাজার মানুষ এক্ত্রিত হতে পারবে , মন প্রান ঢেলে আনন্দ করতে পারবে, প্রতিদিনের বিচ্ছিন্নতা বোধ থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হবে । সেই ধরনের একটি মেলার জন্য বিশেষ ভাবে ননী চক্রবর্তী । তার নেতৃত্বে সেক্টর সমন্বয় কমিটির সদস্য রা কেন্দুলি ,শান্তিনিকেতন মেলার অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেন । এই মেলা সেক্টর সমন্বয় কমিটির হাতে না রেখে দুরগাপুর সাংস্কৃতিক মেলা কমিটির তত্ত্বাবধানে করার সিদ্ধান্ত হয় যাতে প্রকল্পের অফিসারস সহ বিভিন্ন মতাবলম্বী মানুষ ও এই মেলায় যুক্ত থাকতে পারেন । এই মেলা  প্রধানতঃ শিল্প মেলা, কৃষি মেলা ,বই মেলা ,এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের একত্রিত রুপ । প্রতি বছর ১ লা জানুয়ারি থেকে ১০ ই জানুয়ারি পর্যন্ত প্রকল্পের লেনিন ময়দানে এই এই মেলা অনুষ্ঠিত হয় ।
সুখেন বাবু আরও বলেছেন " মেলার উদ্বৃত্ত অর্থ  যথাযথ হিসাবের পর এই অর্থ পার্ক নির্মাণে ও 
উন্নয়নের কাজে ব্যয় হয়, এই সম্পর্কে একটি উপদেস্থা কমিটি গঠিত হয়েছে । এ জোনে রবীন্দ্র উদ্যান , বি জোনে নজরুল উদ্যান , গড়ে উঠেছে ।"
সুখেন বাবু তারপর যা বলেছেন " প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা প্রয়োজন যে অতীতে কল্পতরু মেলা নামে ডি ভি সি কলোনিতে একটি মেলা হত ,সেটি ১৯৬৯-৭৪ সাল পর্যন্ত লেনিন ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় যার দায়িত্বে ও নেতৃত্বে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে আই এন টি ইউ সি পরিচালিত ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের হাতেই মুখ্যতঃ অর্থ সংগ্রহ এবং অন্যান্য বিষয়ে যে দুর্নীতি সংগঠিত হত তাতে এই অঞ্চলের মানুষের কাছে প্রকল্পের কর্মীদের ভাবমূর্তি ম্লান হয়ে জেত । আমাদের ইউনিয়নের সাথে এই মেলার কোন সম্পর্ক ছিলনা । অর্থ সংগ্রহের ব্যাভিচার এমন অবস্থায় পৌছায় প্রকল্পের আধিকারিরা এই মেলা বন্ধ করে দেয় ।"
গঠিত হয় ন্তুন মেলা কমিটি দুরগাপুর সাংস্কৃতিক মেলা কমিটি যার মুখ্য উপদেস্থা সুখেন সরকার । ১৯৮২ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সেক্টর সমন্বয় কমিটির নামে বেনামে সি পি আই এম পরিচালনা করেছে ।
রাজ্যে রাজনীতির পরিবর্তনের পর দেবদাস মজুমদারের নেতৃত্বে একটি মেলা কমিটি গঠন হয় ।
তাদের দ্বারাই বর্তমানে এই মেলা পরিচালিত হচ্ছে ।

No comments:

Post a Comment